HA

Post Top Ad

AS-2

The Relaxation Time

Travel the World!

Post Top Ad

ভিন্ন রকম খবর

শামস আল-মারিফ: বইটি নিয়ে আজও কেন এত বিতর্ক

বইটির নাম শাসস আল-মারিফ। শামস আল-মারিফ মানে ‘জ্ঞানের সূর্য’। বইটির ভাষা আরবি। লেখা হয়েছে প্রায় ৮০০ বছর আগে ত্রয়োদশ শতকে। আলজেরীয় সুফি সাধক পণ্ডিত আহমাদ আল-বুনি এটির লেখক। আইয়ুবি শাসনামলে মিশরে বসবাসকালে বইটি লেখেন তিনি। ১২২৫ সালের দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। শামস আল-মারিফে মূলত আরব ও ইসলামি বিশ্বের জাদুবিদ্যার মূল বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন আধ্যাত্মিক সৃষ্টিতত্ত্ব থেকে শুরু করে জ্যোতিষশাস্ত্র, বিশেষ করে চন্দ্র সম্পর্কিত জাদু, আত্মা ও জিন নিয়ে কারবার, বর্ণমালা ও সংখ্যার জাদুকরী প্রয়োগ প্রভৃতি বিষয় বইটিতে আলোচনা করা হয়েছে। বইটিকে সাধারণত আরব বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী পুস্তক বিবেচনা করা হয়। একইভাবে পাশ্চাত্য ও প্রতীচ্যেও বইটি সমানভাবে আলোচিত ও জনপ্রিয়। জনপ্রিয় হলেও এটি ইসলামি ইতিহাসের বেশির ভাগ সময় নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি পড়তে অনুৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও বইটির পঠন-পাঠন অব্যাহত রয়েছে। তবে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত আরব বিশ্বে বইটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। বইটি বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর বই কি না, এমনকি এটা পড়া হারাম কি না–এমন প্রশ্নও করে থাকেন অনেকে। এর কারণ, ইসলাম ও এর মূল ধর্মীয় উৎসগুলোর ব্যাপারে জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে রহস্যময় ও গুপ্ত পন্থা অবলম্বনে যেসব বিপদ রয়েছে তার প্রতীক এই বইটি। সে কারণে সুফি পণ্ডিতের লেখা হলেও সুফিদের সবাই বইটির পঠন-পাঠনের পক্ষে নন। তবে নকশবন্দি-হাক্কানি ঘরানার কিছু সুফি গোষ্ঠী এর অধ্যয়নের বৈধতা দিয়েছে। তারা এটাকে জাদুবিদ্যার সংকলন হিসেবে ব্যবহার করে ও উচ্চ মর্যাদা দেয়। তবে যাদের গুপ্তবিদ্যা চর্চার ব্যাপারে নিষিদ্ধ আকর্ষণ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বইটি পড়ার ‘বিপদ’ রয়েছে। বিপদটি হচ্ছে, গুপ্তবিদ্যার চর্চা একজন মুসলিমকে সত্য ও সুন্দরের পথ থেকে জিন, জাদু-টোনা ও কুসংস্কারের অন্ধকার জগতে নিয়ে যেতে পারে। আল্লাহর ৯৯ নাম সুফি ধারার পণ্ডিতদের মতে, অন্যান্য ইসলামি টেক্সট বা গ্রন্থগুলোর মতো কোরআনের ভাষা ও শব্দগুলোর বাহ্যিক বা প্রকাশ্য অর্থের পাশাপাশি একটা ‘লুক্কায়িত’ অর্থ রয়েছে। এই লুক্কায়িত অর্থগুলো এমন সত্যের প্রকাশ ঘটায়, যা ওই গ্রন্থ ভাসা ভাসা পড়লে এসব অর্থ অনুদ্ঘাটিত থেকে যেতে পারে। এ কারণে সুফিরা তাদের পবিত্র গ্রন্থগুলো সম্পূর্ণরূপে বোঝার জন্য অনেক সময় ও শ্রম ব্যয় করেন। যেহেতু পবিত্র কোরআনই তাদের মনোযোগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু, তাই এতে উল্লিখিত আল্লাহর ৯৯টি নামও (যাকে আরবিতে ‘আসমা আল-হুসনা’ বলা হয়) তাদের আগ্রহের মূলে রয়েছে। মুসলিমদের বিশ্বাস, এই নামগুলো আল্লাহর বিভিন্ন গুণাবলি বর্ণনা করে। যেমন, পবিত্র কোরআনে উল্লিখিত আল্লাহর অন্যতম নাম আর-রহমান যার অর্থ ‘পরম করুণাময়’। একইভাবে আল-খালিক যার অর্থ সৃষ্টিকর্তা। সুফিরা বিশ্বাস করেন, এই নামগুলো একটা আধ্যাত্মিক শক্তিও বহন করে। আল-বুনির শামস আল-মারিফ হচ্ছে আল্লাহর সেই ৯৯টি নামের বৈশিষ্ট্য এবং সেগুলো ব্যবহারের একটি মহা সংকলন গ্রন্থ। আল বুনি লিখেছেন, আল্লাহর প্রতিটি নামে একটি নির্দিষ্ট শক্তি যুক্ত রয়েছে। তাই কোনো মুমিন বান্দা যদি ‘আল-আলিম’ (আল্লাহর অন্যতম নাম, যার অর্থ জ্ঞানী) একটি নির্দিষ্ট সংখ্যকবার পাঠ করে, তাহলে সে ঐশ্বরিক জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশাধিকার পায়। একইভাবে ‘আল-কাউয়ি’ (আল্লাহর আরেকটি নাম যার মানে শক্তিশালী) পাঠ করলে ঐশ্বরিক সুরক্ষা পাওয়া যায়। আলজেরীয় বংশোদ্ভূত এ পণ্ডিত আরও দাবি করেন, এই ঐশ্বরিক নামগুলোর জিকিরে অতীতে নানা অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। যেমন, মৃতদের জীবিত করে তোলার অলৌকিক ঘটনা ও হজরত ঈসা (আ.) ও মুসা (আ.)-এর আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার ক্ষমতা। এসব দাবি মূলধারার সুফি বিশ্বাসের সঙ্গে মিল রয়েছে। তবে বইটি নিয়ে তখনই বিতর্ক ও সমালোচনা শুরু হয়, যখন আল-বুনি আল্লাহর নাম ব্যবহার করে তাবিজ তৈরির বিষয়ে বিভিন্ন নির্দেশিকা ও সংখ্যাতত্ত্বের মতো জাদুবিদ্যার বিভিন্ন কৌশলের কথা লেখেন। শুধু তাই নয়, ফসল ও সম্পদ বৃদ্ধি এবং ভালোবাসার মানুষ খুঁজে পাওয়ার মতো বিচিত্রসব বিষয়ের তাবিজ-কবজের কথা বইটিতে রয়েছে। জাদুর (স্কয়ার) বর্গ ও জিনসাধনা শুরুতেই বলা হয়েছে যে, বইটিতে জাদুবিদ্যার মৌলিক বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছে। এর প্রথম সংস্করণের দুটি অধ্যায়জুড়েই নানা রঙের টেবিল, প্রার্থনা চার্ট ও সংখ্যাতাত্ত্বিক সাইফার বা সংকেত দিয়ে ভরা, যা বিভিন্ন ভাষা ও শব্দের লুক্কায়িত অর্থ বের করতে ব্যবহার করা হয়েছে। আহমাদ আল বুনি গণিতবিদ ছিলেন। কোরআনের ২৮টি হরফ নিয়ে তিনি একটি তত্ত্ব দিয়েছিলেন যে, আরবি অক্ষরের সব কটিরই সংখ্যাগত মান রয়েছে। যে যুক্তি তিনি তুলে ধরেছিলেন কোরআনে উল্লিখিত বিভিন্ন রহস্যময় অক্ষর সমষ্টির রেফারেন্সের মাধ্যমে। ‘মুকাত্তাআত’ নামে পরিচিত ওই রহস্যময় অক্ষর সমষ্টি, যার মাধ্যমে কোরআনের ১১৪টি সুরার মধ্যে ২৯টি শুরু হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ কোরআনের দীর্ঘতম সুরা আল বাকারাহ ‘আলিফ, লাম, মিম’ অক্ষরগুলো দিয়ে শুরু হয় এবং সুরা মরিয়ম শুরু হয় ‘কাফ, হা, ইয়া, আইন, ছোয়াদ’ দিয়ে। আপাত অর্থহীন এই অক্ষরগুলোরও একটা রহস্যময় অর্থ ও এমনসব বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে মনে করা হয়, যা মুমিনের ইচ্ছা পূরণ করতে পারে। শামস আল-মারিফে অক্ষর ও সংখ্যা ব্যবহার করে আল-বুনি বিস্তৃত চার্ট তৈরি করেছেন, যা বিশেষ পদ্ধতিতে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। যদিও আল-বুনির যুগের কয়েক শতাব্দী আগেই ভারত ও ইরাকের মতো অঞ্চলে এই জাদুর বর্গ ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু তার (আল-বুনির) কাজগুলো ছিল প্রথম গুপ্ত সংকেতগুলোর অন্যতম, যা মুসলিমদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এই ধারণাগুলো ১৫ শতক নাগাদ সুফিদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এগুলো এতটাই ব্যাপক হয়ে ওঠে যে, সংখ্যাতাত্ত্বিক চার্টগুলো পরে ভারতে সেনাদের উর্দির নিচের কাপড়ে পর্যন্ত অনুলিপি করা হতো। কারো ঝাড়ফুঁক করার জন্য কীভাবে ফেরেশতা ও ভালো জিন ডেকে আনতে হয়, সে বিষয়েও নানা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন আল-বুনি। একই সঙ্গে কেউ যেন ভুলবশত খারাপ জিনকে ডেকে না ফেলে সেই সতর্কতাও উল্লেখ করেছেন তিনি। শামস আল-মারিফের সমালোচনা ও নিন্দা শামস আল-মারিফ প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই বইটি নিয়ে নানা আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্ক চলে আসছে। পরবর্তীকালের অনেক লেখক ও পণ্ডিত বইটির পাশাপাশি এর লেখকের সমালোচনা করেছেন। সমালোচকদের মধ্যে চতুর্দশ শতকের সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন ও ধর্মতাত্ত্বিক ইবনে তাইমিয়ার মতো পণ্ডিত রয়েছেন। তারা উভয়েই আল-বুনি ও তার সমসাময়িক ইবনে আরাবিকে ‘ধর্মবিরোধী’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। আর তাদের লেখালিখির বিষয়বস্তুকে ‘সিহর’ বা জাদু বলে নাকচ করে দিয়েছিলেন। কারণ, ইসলামে জাদু কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ ক্ষেত্রে ইবনে খালদুন ও ইবনে তাইমিয়া হজরত মুহাম্মদের (সা.) রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছিলেন। আর সেটা হচ্ছে, মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘তিনজন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না: সে ব্যক্তি যে মদের নেশায় আসক্ত, সে যে সম্পর্ক ছিন্ন করে ও সে যে জাদুতে বিশ্বাস করে।’ কিন্তু তাদের এ ধরনের নিন্দা বইটির পাঠের আগ্রহ রোধ করার জন্য যথেষ্ট ছিল না, এমনকি মূলধারার মুসলিমদের মধ্যেও। যেমনটা বলছেন নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিলিজিয়াস স্টাডির সহযোগী অধ্যাপক নোয়াহ গার্ডিনার। মিডল ইস্ট আইকে এক সাক্ষাৎকারে এই অধ্যাপক বলেন, ‘প্রাক-আধুনিক যুগের মুষ্টিমেয় পণ্ডিত তার (আল-বুনি) লেখাগুলোকে ‘জাদুকরী’ বলে সমালোচনা করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার রচনাগুলো উনিশ শতাব্দীতে উচ্চশিক্ষিত, ধার্মিক এবং কখনো কখনো রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী মুসলিমদের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে মুদ্রণ-পুনর্মুদ্রণ ও পঠন-পাঠন হয়েছিল।’ গার্ডিয়ান নিজে আল-বুনি ও তার জাদুবিদ্যা সম্পর্কিত বিষয়গুলোর ওপর একটি বই লিখেছেন। এই লেখক আরও বলেন, ‘আজও তার লেখার জন্য প্রচুর পাঠক ও শ্রোতা রয়েছে। আল-বুনির পরিচিতি ছিল একজন ধর্মতত্ত্ববিদ, গণিতবিদ ও দার্শনিক হিসেবে। তাকে একজন সুফি ওস্তাদ হিসেবে বিবেচিত করা হতো। তাকে নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন বিখ্যাত পণ্ডিত ইবনে আরাবি। তারা এমন এক যুগে বাস করত, যেখানে রহস্যবাদ মুসলিমদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল। একই ধরনের ধারণা লালন করেন এমন আরও অনেক রহস্যবাদী বা অতীন্দ্রিয়বাদী ছিলেন, যাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল খোদা বা আল্লাহকে জানা। আল-বুনি ও অন্যরা যারা সেই সময়ে সৃষ্টিতত্ত্ব ও এ ধরনের বিদ্যাচর্চা করতেন তারা নিজেদের জাদুকর হিসেবে বিবেচনা করতেন না। গোপন জ্ঞানের অধ্যয়ন করছেন বলেই ভাবতেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গার্ডিনার আল-বুনির সম্পর্কে লিখেছেন, শুধু ভালো জানাশোনা আছে সুফিদের এমন একটি গোষ্ঠীর মধ্যে পঠন ও পাঠনই ছিল আল-বুনির বইটির উদ্দেশ্য। যেমন বইটিতে বলা আছে, ‘যার হাতে আমার এই বইটি আছে তার জন্য এটি তার সম্প্রদায়ের নয় এমন কাউকে দেখানো ও যে এটির যোগ্য নয় তার কাছে প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।’

Realted Posts

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Top Ad